জানেন কী চার ধামের মধ্যে অন্যতম পুরী ধাম। বিশ্বাস করা হয় এখানে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং জগন্নাথরূপে আছেন। জানেন কী এখানেই আছে 'যমশীলা', যাতে পা দিলেই সর্বনাশ! এমনই নানান অজানা রহস্যে গাঁথা আমাদের প্রতিবেদন।
যদি কখনও না পুরীতে গিয়ে থাকেন, অবশ্যই একবার যান। এখানে পরতে পরতে রহস্য। রহস্যের মোড় কাটতে না কাটতেই দেখবেন আবার কোনও রহস্যের সন্ধান পেয়ে গেছেন আপনারা। এই জায়গাটা শুধু একটি তীর্থ নয়, এখানে গেলে অন্যধরণের অনুভূতি সঞ্চার করবেন। জানেন কী, মন্দিরের চূড়ায় যে পতাকা ওড়ে তা একেবারে হাওয়ার উল্টো দিকে! এখানে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের জন্য ভোগ তৈরি হয়, আশ্চর্যজনক বিষয় হল সেই ভোগের একফোঁটাও নষ্ট হয় না। বিষ্ময় লাগছে তো? আগেই বলেছি পুরার জগন্নাথ মন্দিরে পরতে পরতে রহস্য। চলুন আজ আমর জেনে এমনই কিছু রহস্য আর প্রভু জগন্নাথ দেবের মাহাত্ম্য কথা।
আচ্ছা, বলতে পারবেন কে জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? কবে থেকেই বা জগ্নাথ দেবের পুজো শুরু হয়? তাহলে জানুন জগন্নাথদেবের পূজা শুরু হয় কলিযুগের শুরুতেই, অর্থাৎ প্রায় হাজার হাজার বছর আগে। পুরাণ মতে, দ্বাপর যুগের শেষে, দ্বারকা নগরী ডুবে যাওয়ার পর শ্রীকৃষ্ণের কিছু দেহাবশেষ (বিশেষত হৃদয়) ভেসে আসে সমুদ্রতটে। এই রহস্যময় ঘটনার সূত্র ধরে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদেশ পান — 'সমুদ্রতটে ভেসে আসবে এক অলৌকিক কাঠের গুঁড়ি, তা থেকেই নির্মাণ করতে হবে আমার মূর্তি।' সেই থেকেই শুরু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পূজা। জানেন কী, এটাই জগন্নাথদেবের দারু-বিগ্রহ রূপ — যা বিশ্বের আর কোনও মন্দিরে নেই।
রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন একজন মহাভক্ত ছিলেন। তিনি চাইতেন এমন একটি মূর্তি তৈরি হোক, যা ঈশ্বরের আত্মতত্ত্ব বহন করে। একদিন এক রহস্যময় বৃদ্ধ কারিগর (যে বিশ্বকর্মা স্বয়ং, বলে মনে করা হয়) রাজদরবারে আসেন এবং বলেন — 'আমি মূর্তি তৈরি করব, তবে এক শর্তে — কাজ চলাকালীন কেউ আমাকে দেখতে পারবে না।' রাজা রাজি হন, কিন্তু বহুদিন দরজা বন্ধ থাকায় রাজা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং দরজা খুলে ফেলেন। দেখা যায় — তিনটি মূর্তি অসম্পূর্ণ — হাত ও পা নেই। কিন্তু ততক্ষণে সেই বৃদ্ধ উধাও। হতাশ রাজার কানে হঠাৎ ভেসে আসে এক দৈববাণী। 'এই রূপেই আমি পূজিত হতে চাই। এটাই আমার ইচ্ছা।' এভাবেই জগন্নাথদেব আসেন ধরাধামে।
জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরি হয় একটি বিশেষ কাঠ দিয়ে — নিম কাঠ, কিন্তু সাধারণ নিম নয়! এই কাঠকে বলা হয় 'দারু ব্রহ্ম'। তাতে থাকে নানান ধরণের চিহ্ন, যেমন- শঙ্খ, চক্র বা গজপদ চিহ্ন, সেখানে থাকে চলমান গন্ধ, শুধু তাই নয় কাছে গেলেই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। সবথেকে আশ্চর্যজনক কথা হল এই নিমকাঠ থেকে চন্দনের মতো গন্ধ বের হয়।
প্রতি নবকলেবরের সময় এক অলাকিক ঘটনা ঘটতে থাকে, সেটা কী জানেন? যখন নিমকাঠ খোঁজা হয় অর্থাৎ 'দারু অন্বেষনের' সময় বহু পুরোহিত আর দিক্ষিত সেবায়েত যান এই নিম কাঠ খুঁজতে, সেখানে গিয়ে আচমকা নিমকাঠ থেকে তাঁরা চন্দনের গন্ধ পেতে থাকেন। তখন সব্বাই বুঝে যান এটাই দারু বৃক্ষ। এই গাছ যেখানে থাকে সেখানটা থাকে খুবই নির্জন, এমনকি সেখানে পাখির ডাকও শোনা যায় না। কথিত আছে এই গাছ নিজে থেকে ডাক দেন ভক্তদের।
জগন্নাথদেবের মূর্তি কোনও সাধারণ নয়, তাই তাঁকে জীবন্ত দেহে রাখা হয়। প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর এক বিশেষ মহাযজ্ঞ হয়, যাকে বলা হয় নবকলেবর — অর্থাৎ নতুন দেহ। এই সময় পুরনো মূর্তির হৃদয়াংশ (যাকে বলে ব্রহ্মতত্ত্ব) স্থানান্তর করা হয় নতুন কাঠের মূর্তিতে। এই পুরো ঘটনা চলে রাতের অন্ধকারে, গোপনে। কারো দেখা নিষেধ। এই পুরো ঘটনা চলে রাতের অন্ধকারে, গোপনে। কারো দেখা নিষেধ। তাই জানা যায়, এই সময়কালে পুরী ডুবে থাকে অন্ধকারে। এ যেন ঈশ্বরের নিজের শরীর বদলের অলৌকিক উৎসব!
জগন্নাথদেবের মূর্তি দেখলে আপনি বুঝবেন — এটা কেবল একটি বিগ্রহ নয়। এটা এমন এক জীবন্ত দেহ, যা নিজেই ডাকে ভক্তকে, নিজেই ঠিক করে কখন দেহ বদলাবে, কোথা থেকে তার কাঠ আসবে, আর কীভাবে সে প্রকাশ পাবে। এই গল্পই আমাদের শেখায় ভগবানকে দেখার জন্য চাখ নয়, বরং দরকার বিশ্বাস।
ইতিহাস বলে, ১২০০ শতকে গঙ্গা রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গদেব এই বিশাল মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তাঁর রাজত্ব ছিল, ক্ষমতা ছিল, কিন্তু এই মন্দির গড়ার পেছনে ছিল শুধুই ভক্তি। আবার পুরাণ বলে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদেশ পেয়ে স্বয়ং বিশ্বকর্মার সাহায্যে নির্মাণ করেছিলেন ভগবান জগন্নাথের কাঠের মূর্তি।
আগেই বলেছিলাম এই মন্দিরের পরতে পরতে রহস্য। এই মন্দিরের চূড়ার পতাকা যেমন হাওয়ার বিপরীত দিকে ওড়ে, ঠিক তেমনই মন্দিরে ঢোকার মুখে দাঁড়ালে সাগরের গর্জন আর শোনা যায় না! দু-এক কদম বাইরে গেলেই সেই শব্দ আবার ফিরে আসে! দিনের যেকোনও সময়, সূর্য যে দিকেই থাকুক, প্রধান গম্বুজে কোনও ছায়া পড়ে না। মন্দিরের চূড়ায় থাকা চক্রটি যেদিক থেকে দেখুন না কেন, মনে হয় — সে আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে। আবার প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ভক্তের জন্য প্রসাদ তৈরি হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় — কখনও তা কম পড়ে না, আর তা এক দানাও অপচয় হয় না।
জগন্নাথ মন্দিরে রোজ বৈদিক নিয়মে পুজো হয় আর সেই নিয়মের কিছু দিক একেবারে অভিনব। মঙ্গল আরতি দিয়ে শুরু হয় দিন। ভগবানকে নিবেদন করা হয় ৫৬ প্রকারের ভোগ। সন্ধ্যায় হয় সান্ধ্য আরতি। রাতে ভগবান ‘বিশ্রাম’ নেন তাঁর বিশ্রামাগারের বিছানায়। মোট ২৬টি নিয়মে চলে প্রতিদিনের সেবা।
আষাঢ় মাসে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে গুণ্ডিচা মন্দিরে যান। লাখ লাখ মানুষ সেই রথ টানেন — কে বড়, কে ছোট, সে হিসেব থাকে না। শুধু থাকে ভক্তি আর অশ্রুসিক্ত আনন্দ। পুরীর রথযাত্রা শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। এটি চারধামের একটি — বদ্রীনাথ, রামেশ্বরম, দ্বারকার সঙ্গে একই আসনে বসে পুরীও। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শঙ্করাচার্য, রামানন্দাচার্য — সব সাধকের পা পড়েছে এখানে। ISKCON-এর মাধ্যমে জগন্নাথ নাম ছড়িয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। UNESCO ও আন্তর্জাতিক সংস্থা মন্দিরের স্থাপত্য ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি দিয়েছে।
জগন্নাথ মন্দির কেবল ইট-কাঠ-পাথরের এক নির্মাণ নয়। এখানে ভক্তের সঙ্গে ভগবানের সাক্ষাত হয়। কখনও যদি মনে হয়, 'ভগবান কি সত্যিই আছেন?', তাহলে একবার গিয়ে দাঁড়ান এই মন্দিরের সামনে। হয়তো বিজ্ঞান কিছু বুঝবে না, কিন্তু আপনার হৃদয় বলবে — তিনি আছেন এবং এখানেই আছেন।